আমাজনের আদিবাসীগোত্র ‘মাসকো পিরো’ বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন

আমাজন জঙ্গলের মধ্যে দুর্গম অঞ্চলে বসবাসরত আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সদস্যদের সাথে এতদিন পর্যন্ত কোন সরকার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেনি। তবে সম্প্রতি প্রথমবারের মতো যোগাযোগের চেষ্টা করছেন পেরুর সরকারের পক্ষে কর্মরত নৃবিজ্ঞানীরা। পার্শ্ববর্তী গোত্রগুলোর ওপর হামলা ও অভিযানসহ বিভিন্ন বিষয়ে ক্রমবর্ধমান উদ্বেগের মধ্যে বাকি পৃথিবীর থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন মাসকো পিরো মানুষের আচরণ নৃবিজ্ঞানীরা এ উদ্যোগ গ্রহণ করলেন।

দক্ষিণ আমেরিকার বিশাল আমাজন অঞ্চল হচ্ছে এমন, বিশ্বে এখনো পর্যন্ত যোগাযোগের বাইরে অবস্থান করা কিছু আদিবাসী গোষ্ঠীর আবাসভূমি। যে কারণেই হোক, সহজাতভাবেই স্বতন্ত্র এসব সম্প্রদায় প্রায় সামগ্রিকভাবেই নিজ নিজ জাতি রাষ্ট্রের আওতার বাইরে নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, এই কোম্পানিগুলোর নানা চেষ্টার কারণে বাইরের বিশ্বের সাথে তাদের পুরোপুরি যোগাযোগ স্থাপিত হতে পারে এবং তারপর কাঠ ও খনিজ সম্পদ আহরণকারী কোম্পানিগুলোর প্রতারণার তাদের স্বতন্ত্র জীবনব্যবস্থাও ধ্বংসের হাত থেকে রেহাই পাবে না।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে কয়েকটি দেশের সরকার এই ধরনের সম্প্রদায়গুলোকে বাইরের যোগাযোগ থেকে রক্ষা করতে প্রতিরক্ষামূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। কারণ এর সাথে গোত্রগুলোর ব্যাপক স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয় জড়িত। সর্বোপরি কেউ কেউ বলে থাকেন যে, আমেরিকায় ইউরোপীয়রা পৌঁছানোর কারণে বাইরে থেকে আসা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১০ কোটিরও বেশি আদিবাসী আমেরিকান বা রেড ইন্ডিয়ান মারা গেছেন।
পেরু সরকার তার সীমানার মধ্যে আমাজনে বসবাসকারী যোগাযোগের বাইরে অবস্থানকারী আদিবাসী উপজাতিগুলোর সাথে যোগাযোগ স্থাপন নিষিদ্ধ করেছে। এসব উপজাতি তাদের নিজস্ব সীমানার মধ্যেই বসবাস করে। এটি সরকারের আগের নীতি থেকে অনেকটা ইতিবাচক স্থানান্তর, আগে সরকার তাদের অস্তিত্ব স্বীকার করত না। আদিবাসী মানুষের জন্য ব্রাজিলের নিজস্ব ফেডারেল সংস্থা রয়েছে। ২০১১ সালে তারা জঙ্গলে তাদের পর্যবেক্ষণের জন্য অভূতপূর্ব চিত্র পেতে ক্যামেরা নিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দেয়।

মানবাধিকার গ্রুপগুলো ও কর্মীরা দীর্ঘ দিন ধরে আমাজনের ভেতরে আদিবাসী ভূখণ্ডগুলো রক্ষা করার দাবিতে আন্দোলন করে যাচ্ছেন। তারা তেল কোম্পানিগুলোর লুণ্ঠনমূলক কর্মকাণ্ডের সাথে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা বেদনাদায়ক সহিংসতার ইতিহাসের শিকার উপজাতিদের রক্ষার জন্য আন্দোলন করছেন। এতে দেখা গেছে যে, ঔপনিবেশিক বসতিস্থাপনকারী, কাঠ ব্যবসায়ী ও মানবপাচারকারীদের সহিংসতার শিকার হয়ে নির্মূল হয়ে গেছেন আদিবাসী মানুষেরা।

বিশ্বব্যাপী আদিবাসী সম্প্রদায় ও উপজাতিদের অধিকার নিয়ে কাজ করছে ‘সারভাইভাল ইন্টারন্যাশনাল’ নামক একটি সংস্থা। তারা বলেছে, যোগাযোগের বাইরে থাকা এসব আদিবাসীদের রক্ষার জন্য পেরু ও ব্রাজিল যথেষ্ট কিছু করছে না। সংস্থাটি মাসকো পিরো ভূখণ্ডের কাছে পর্যটকদের জন্য ‘মানব শিকার’ কেন্দ্র স্থাপনের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে।

টাইম ম্যাগাজিনের বিজ্ঞান সম্পাদক জেফরি কুজার সম্প্রতি সাইন্স ম্যাগাজিনের একটি গবেষণার কথা স্মরণ করেন যেখানে যোগাযোগের বাইরে থাকা আদিবাসীদের সাথে আচরণের চ্যালেঞ্জ ও নৈতিকতাসমূহ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হয়েছে। এতে আদিবাসী সম্প্রদায়ের বেদনাদায়ক পরিণতির বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। যোগাযোগের বাইরে থাকা এই সম্প্রদায়গুলোর সাথে বাইরের যোগাযোগ যে কতটা ঝুঁকিপূর্ণ তা তুলে ধরা হয়েছে : যেসব বস্তু এক শরীর থেকে আরেক শরীরে যায় তাদের ক্ষেত্রে তা সম্পূর্ণরূপে নিয়ন্ত্রণ করা উচিত। (সাংবাদিক এন্ড্রু) ললার পেরুর ৬৯ বছর বয়সী গ্রামবাসী মার্সেল পিনেদো সেসিলিওর সাথে কথা বলেন, যিনি জঙ্গলে জন্মগ্রহণ করলেও পরে আত্মপ্রকাশ করেন। একজন বহিরাগতের সাথে সেসিলিও প্রথম সাক্ষাতের কথা স্মরণ করেন। তিনি সেই বহিরাগতকে একজন এথনোগ্রাফার ও চিত্রগ্রাহক ভেবেছিলেন। সেসিলিও মাছের হাড়ের একটি নেকলেসের উপহার সাথে নিয়ে গ্রামবাসীকে ত্যাগ করেন। তারপর শিগগিরই বেশির ভাগ আদিবাসীরা গলাভাঙা ও জ্বরে আক্রান্ত হন এবং তাদের মধ্যে ২০০ জন মারা যান। ১৯৮০’র দশকে মার্কিন তেল কোম্পানি শেলের শ্রমিকদের সাথে পরিচয়ের পর পেরুর ৪০০ গ্রামবাসী মারা যান। এরই ফলে পেরুর মাসকো পিরো আদিবাসীদের ব্যাপারে বর্তমান তদন্ত সমালোচকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।

পেরুর আঞ্চলিক আদিবাসী ফেডারেশন ‘ফেনামাদ’ এর প্রেসিডেন্ট কাউস কুইককুই রয়টার্সকে বলেন, ‘কতৃপক্ষের উচিত তাদের এলাকায় নৌকা প্রবেশ ও অন্য মানুষদের তাদের কাছে যাতায়াত নিয়ন্ত্রণ করা।’

মে মাসের একটি ঘটনায় যোগাযোগের বাইরের থাকা কতটা যে জরুরি তা উপলব্ধি করা যায়। ওই সময় আদিবাসী সম্প্রদায়ের কিছু সদস্য অন্য একটি স্থানীয় সম্প্রদায়কে আক্রমণ করে ও তীর দিয়ে একজন যুবককে হত্যা করে। যারা ইয়াইন ভাষায় কথা বলতে পারেন দোভাষী হিসেবে এমন কর্মকর্তাদের তালিকাভুক্ত করা হয়। মাসকো পিরো মানুষ যে ভাষায় কথা বলে ইয়াইন ভাষাতেও একই অর্থ প্রকাশ পায়।

২০১৩ সালে মাসকো পিরো আন্তর্জাতিক মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় যখন আদিবাসী সম্প্রদায়টির কয়েক ডজন সদস্য ছোট ইয়াইন শহরের নিকট আমাজন উপনদীর তীরে হাজির হয়ে দড়ি, বল্লম, রামদা ও কলা দাবি করেছিলেন। ফেনামাদ অশ্বারোহী সৈন্যদল সেখানে অবস্থান গ্রহণ করে ও তাদের নদী পার হওয়া থেকে বিরত রাখে। কিন্তু আদিবাসী সম্প্রদায়টির কিছু মানুষ তাদের সাথে ধনুক ও লম্বা কাঠের বল্লম নিয়ে আসায় সেখানে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। কাছাকাছি অবস্থান করা গ্রামবাসীরা, খ্রিষ্টান মিশনারিরা ও অনিয়মিত পর্যটকেরা সবাই মাসকো পিরো মানুষের সাথে সাক্ষাৎ করেছিলেন বলে শোনা যায়।

রাষ্ট্রীয় আদিবাসী বিষয়ক অফিসে কর্মরত পেরুর একজন কর্মকর্তা লুইস ফিলিপ টোরেস রয়টার্সকে বলেছিলেন, ‘তারা যে যোগাযোগের চেষ্টা করেনি, আমি তা বলতে পারব না, এমনটি করার অধিকারও তাদের আছে।’

বিশেষজ্ঞরা এসব আদিবাসীকে ‘যোগাযোগের বাইরে’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন তা আসলে নামের ভুল প্রয়োগ। এই নামটি পৃথিবীর সেসব সম্প্রদায়কে দেয়া হয়েছে যারা তাদের প্রতিবেশীদের সম্পর্কে সচেতন ও তাদের বাড়ির বাইরে বৃহত্তর বিশ্ব সম্পর্কে কিছুটা হলেও ধারণা রাখে।

অ্যারিজোনা স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানী কিম হিল বিবিসির সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, ‘বিচ্ছিন্ন আদিবাসীগুলো সম্পর্কে মানুষের এই রহস্যময় দৃষ্টিভঙ্গি হলো, তারা আধুনিক বিশ্ব থেকে সরিয়ে নিজেদের অশুভ বিশ্বের মধ্যে আটকে রেখেছে।’ কিন্তু এ রকম ঘটনা কদাচিৎ দেখা যায়। হিল বলেন, ‘একটি গ্রুপের বিচ্ছিন্ন থাকার মতো আর কিছু নেই, কারণ তারা চিন্তা করে যে, এই গ্রহের অন্য আর কারো সাথে যোগাযোগ না থাকাটাই ভালো।’

সাইন্স ম্যাগাজিনের একটি লেখায় হিল ও তার সহকর্মী রবার্ট ওয়াকার বারবার একটি বিষয় পুনরাবৃত্তি করেছিলেন। তারা বলেন, দক্ষিণ আমেরিকার যোগাযোগের বাইরে থাকা অনেক সম্প্রদায় মৃত্যু বা ক্রীতদাস হওয়ার ভয়ে বিচ্ছিন্ন থাকাকে বেছে নিয়েছে এবং এর কারণে বেশির ভাগ মানুষ অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বসবাস করছে। তারাও বাইরের পণ্য, নতুনত্ব ও প্রতিবেশীদের সাথে ইতিবাচক সামাজিক যোগাযোগ চায়।

শিক্ষাবিদরা পরামর্শ দিয়েছেন, সবচেয়ে উত্তম উপায় হচ্ছে এসব সম্প্রদায়ের সাথে ‘নিয়ন্ত্রিত যোগাযোগের’ নীতি অবলম্বন করা, সতর্কতার সাথে রোগের বিস্তার এড়িয়ে যাওয়া এবং একই সাথে পারস্পরিক বিশ্বাস স্থাপন করে যদি প্রয়োজন হয় তাদের সাহায্য ও চিকিৎসা সহায়তা দেয়া।

সূত্র: ওয়াশিংটন পোস্ট

Image Credit: latinamericanpost.com
Image Credit: sciencemag.org

Image Credit: survivalinternational.org

মন্তব্য