নকল রুটি মেকার কিনে ক্রেতারা প্রতারিত হচ্ছেন

|

ঘরে ঘরে এখন ডায়াবেটিস রোগীর অভাব নেই। এসব রোগীদের ভাত এড়িয়ে সকাল-রাতে দুই বেলা রুটি খাওয়ার পরামর্শ দেন চিকিৎসকরা। অনেকেই খান। তবে রুটি বানানোর ঝামেলার কারণে অধিকাংশের পক্ষেই দুই বেলা রুটি খাওয়া সম্ভব হয়ে ওঠে না। আর এই কথা মাথায় রেখেই ২০১১ সালে মাগুরার হুমায়ুন কবীর তৈরি করেন কাঠের তৈরি রুটি বানানোর যন্ত্র, যা দিয়ে সহজেই যে কেউ তৈরি করে ফেলতে পারেন নিজের পছন্দসই আকারের রুটি। নাম দেন লাইবা রুটি মেকার । তখন কথা হয়েছিল হুমায়ুন কবীরের সাথে । দেখিয়েছিলেন কত সহজে কাঠের যন্ত্রটি দিয়ে সুন্দর আকারের রুটি বানানো যায়। হতাশার কথা বললেন, তার যন্ত্র দেখে অনেকেই নকল রুটি মেকার তৈরি করে বাজারে ছেড়েছেন। কিন্তু মাপঝোঁক ও কারিগরি ত্রুটির কারণে এগুলোতে ভালো রুটি বানানো যায় না। ফলে ক্রেতা প্রতারিত হচ্ছেন। এ কারণে অনেকে রুটি মেকারের প্রতি আগ্রহ হারাচ্ছেন। এখানেই তার আফসোস।

নিজেকে বিশ্বের প্রথম বিদ্যুৎবিহীন রুটি বানানোর কাঠের যন্ত্রের উদ্ভাবক দাবি করে হুমায়ুন কবীর বলেন, আমার আগে কেউ এ যন্ত্র উদ্ভাবন করতে পারেনি। আর পরে যারা করছেন তারা আমারটা নকল করছেন। কিন্তু সঠিক মাপ-ঝোঁক না দিতে পারায় সেগুলোতে কাঙ্ক্ষিত রুটি বানাতে পারছেন না ক্রেতারা। রুটি মেকারের পেটেন্ট পাওয়ার জন্য চেষ্টা করছেন জানিয়ে তিনি বলেন, এটা পেয়ে গেলে নকলবাজদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিতে পারবেন। কথপোকথনে নিজের উদ্ভাবিত লাইবা রুটি মেকার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পাশাপাশি অন্য রুটি মেকারের সঙ্গে এর পার্থক্য বর্ণনা করেন হুমায়ুন কবীর।

হুমায়ুন কবীর বলেন, ”২০১১ সালে আমি উদ্ভাবন করি রুটি বানানোর কাঠের যন্ত্র এবং নাম দিয়েছিলাম লাইবা রুটি মেকার। এরপর গত পাঁচ বছরে অনেক গবেষণা চালিয়েছি। বাজারে পণ্য ছাড়ার পর গত কয়েক বছরে অনেক নকলবাজ আমার পণ্যটি নকলের চেষ্টা করেছেন। তবে নকলবাজদের কেউই সফল হননি, বরং তারা সফল হয়েছেন ক্রেতাদের ঠকিয়ে। কারণ তারা এই কাঠের যন্ত্রকে আসবাবের মতোই সাধারণ কিছু ভেবেছেন, আর লাইবা রুটি মেকার তৈরিতে যে ধরনের পদ্ধতি ও উপকরণ ব্যবহার করা হয়েছে তাও নকলবাজরা গ্রহণ করেননি। তারা ভুল পদ্ধতিতে যন্ত্রটি তৈরি করে বিক্রি করছেন। তারা একদিকে সঠিক কাঠ ব্যবহার করছেন না। অন্যদিকে কারিগরি ত্রুটিও আছে। এ কারণে ওইসব নকল যন্ত্রে রুটি বানাতে গেলে রুটি ছিড়ে যাচ্ছে, একপাশ পাতলা, অন্যপাশ মোটা হচ্ছে। ঠিকমতো গোলাকারও হচ্ছে না। এতে অসচেতন ক্রেতারা ঠকছেন এবং ভোগান্তির শিকার অধিকাংশ ক্রেতা এসে লাইবা রুটি মেকারের অফিসে অভিযোগ করছেন। তাদের অনেকেই জানিয়েছেন, লাইবা রুটি মেকার ভেবে তারা পণ্যটি কিনেছিলেন, কিন্তু নকল পণ্যটিতে রুটি হয় না।”

নকলবাজ যেসব ভুল করেছে
”লাইবা রুটি মেকার দেখে মনে হয় যে কেউ এটি বানাতে পারবেন, আসলে তা মোটেও ঠিক নয়। এটি অত্যন্ত সুক্ষ জিনিস, এটি যারাই নকলের চেষ্টা করেছেন তারাই ভুল করেছেন। ঠিক পরিমাপ ও পদ্ধতি না জেনে যন্ত্রটি তৈরি করছেন। গত পাঁচ বছর আগে আবিষ্কারের শুরুতে আমি প্রায় ২৩ ধরনের কাঠ নিয়ে গবেষণা করেছি, কিন্তু মেহগনি কাঠের প্লেট ও বাবলা কাঠের হ্যান্ডেল ছাড়া রুটি মেকার তৈরি করা যায় না এই তথ্যটি অনেকেই জানেন না। এছাড়া সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে সুক্ষ পরিমাপ। যেটা আমি আমার গবেষণার এক পর্যায়ে যন্ত্রের সব অংশের একটি নির্দিষ্ট ও সুক্ষ পরিমাপ বের করেছি, যেমন–যন্ত্রটির হ্যান্ডেলের নাট লাগানোর যে স্ট্যান্ডটি রয়েছে তার দৈর্ঘ্য, প্রস্থ ও উচ্চতা কত সেন্টিমিটার হলে সঠিক হবে; নিচ থেকে কত উচ্চতায় নাট ছিদ্র করতে হবে; হ্যান্ডেলটি কত সেন্টিমিটার লম্বা হলে যন্ত্রে রুটি বানাতে চাপ কম লাগবে এবং যন্ত্রের উপরের প্লেটটির সংলগ্ন যে বিস্কিটটি (বিশেষ অংশ) থাকে তার সঠিক উচ্চতা কত হবে। এসব গুরুত্বপূর্ণ পরিমাপ না জেনে কেউ লাইবা রুটি মেকারের যন্ত্র বানাতে চেষ্টা করলে মেশিনটি দেখতে হুবহু হলেও রুটি ঠিকমত হবে না, হওয়া অসম্ভব। এরকম অনুমানের ভিত্তিতে কাঠমিস্ত্রি দ্বারা রুটিমেকার তৈরি করলে রুটি হবে কোথাও মোটা, কোথাও পাতলা। রুটি বানাতে চাপ লাগবে অনেক বেশি এবং রুটি অবশ্যই বড় হবে না।”

”এছাড়া প্রতিটি অংশ সংযোগের ক্ষেত্রে কিছু বিষয় আছে, যা প্রশিক্ষণ গ্রহণ না করলে বোঝা সম্ভব নয়। কারন আমি পাঁচ বছর ধরে যে কারিগরদের প্রশিক্ষণ দিয়েছি তারা এখনও প্রতি ১০০ টি মেশিন তৈরি করলে আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ টি মেশিন বাতিল হয়। এই বাতিল মেশিন আমরা বিক্রি করি না। তাহলে ব্যাপারটা কী দাড়াচ্ছে? আমার দ্বারা পাঁচ বছর ধরে ট্রেনিংপ্রাপ্ত কারিগররাই যেখানে রুটিমেকার বানাতে গেলে ২০% থেকে ২৫% বাতিল হয়, সেখানে নতুন একজন কাঠমিস্ত্রী কীভাবে সঠিক রুটি মেকার বানাবে? হতে পারে সে ফার্নিচারের উপর ২০ বছরের অভিজ্ঞতাসম্পন্ন, কিন্তু রুটি মেকারের উপর সে অবশ্যই নতুন। আমি পাঁচ বছর সাধনা করে এর সুক্ষ ড্রয়িং বের করেছি তাতো কোন নতুন লোকই জানেন না।”

”এ ছাড়া নকলবাজরা যন্ত্রের ভিতরের প্লেটে স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ রঙ, গালা, কারফা, রজন ইত্যাদি ব্যবহার করে তার উপর বেশি করে তেল দিয়ে রুটি বানাতে বলেন, যেটা আসলে আমার আবিষ্কৃত টেকনোলজিই না। কেউ কেউ আবার মোটা পিভিসি ও রেক্সিন ইত্যাদি উপকরণ ব্যবহার করছেন। এতে ক্রেতারা মারাত্মক স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছেন।”

কাঠের তৈরি নকল রুটি মেকার কিনে ক্রেতারা ঠকছেন যেভাবে:

”অধিকাংশ অসচেতন ক্রেতা যন্ত্রের ডিজাইন, ফিনিশিং, রঙ ইত্যাদির ওপর বেশি গুরুত্ব দেন। কিন্তু তারা কখনই যন্ত্রটির সঠিক পরিমাপ, অতি অল্প চাপে রুটি হওয়া বা চারদিকে সমানভাবে পাতলা হওয়া কিংবা স্থায়ীত্ব সম্পর্কে অজ্ঞ থাকেন। সেই অজ্ঞতার সুয়োগ নেয় নকলবাজরা। আর যন্ত্রের সঙ্গে কী কী সরঞ্জাম না থাকলে যন্ত্রটি অসম্পূর্ণ থাকে, তাও ক্রেতারা জানেন না। এমনকি কিছু নকলবাজকেও নকল করছে নতুন নকলবাজরা। তাই এটা আরও বদলে যাচ্ছে। লাইবা রুটি মেকারের সঙ্গে যে ৩০০ বর্গফুটের ফুড কন্টেন্ট পেপার দেওয়া হয় তা মূলত যন্ত্রের একটি অপরিহার্য অংশ। এই পেপার দেওয়া হয় স্বাস্থ্যগত বিষয়ের কথা চিন্তা করেই।

”যারা নকল পন্য বিক্রি করছে তাদের মধ্যে কেউ কেউ ইন্টারনেটের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এবং তাদের মালের দামও কম। এখন কথা হল ইন্টারনেটে সঠিক পরিমাপের ও বেঠিক পরিমাপের দুইটি পন্যের ছবি দেখতে হুবহু একই, এমন পরিস্থিতিতে সাধারণ ভোক্তাগণ সঠিক পরিমাপের রুটিমেকারটি খুঁজে নেবেন কীভাবে? এটা রীতিমত কষ্টসাধ্য এবং অনেকটা অসম্ভব ব্যাপার। ইন্টারনেটের মাধ্যমে বোঝার উপায় নেই কে আপনাকে ৩০০ স্কয়ারফিটের জাপানি ফুডকন্টেন্ট পেপার দিচ্ছে আর কে ঠকিয়ে সাধারণ পলিথিন দিচ্ছে এমনকি ইন্টারনেটের মাধ্যমে আপনি এটাও বুঝতে পারবেন না যে কোন মেশিনে রুটি সঠিক ও পাতলা হয় বা চাপ কম লাগে। বাংলাদেশের শত শত যায়গায় প্রতি মাসেই হাজার হাজার রুটি মেকার তৈরি হচ্ছে, তার মধ্যে আসল লাইবা রুটি মেকার তৈরি হচ্ছে সর্বোচ্চ ২০০ টি। এই সব নকলবাজদের অনেকে আবার লাইবা ব্রান্ডের নামেই রুটি মেকার বিক্রি করছে এবং মানুষকে বোকা বানাচ্ছে। একইসঙ্গে লাইবার সুনাম নষ্ট করছে।

নকল কাঠের রুটি মেকারে রুটি চিকন মোটা হবার আরও একটি কারন:

”প্রত্যেক কাঠের নিজস্ব একটি ভাষা আছে। সেই ভাষা বোঝাটা গুরুত্বপূর্ণ। দেখা যায় আজ আপনি একটি মেশিন বানালেন যার Water Level শতভাগ ঠিক আছে, অর্থাৎ এই মুহূতে রুটির পুরুত্ব ঠিকমত হচ্ছে, কিন্তু ২/৩ মাস পরে দেখা গেল রুটির পুরুত্ব ঠিকমত হচ্ছে না, রুটি এক কোনায় চিকন ও আর এক কোনায় মোটা হচ্ছে, অথবা মাঝখানে মোটা হচ্ছে এবং পাশে চিকন হচ্ছে। এর কারণ হল যন্ত্রের কাঠের আদ্রতা লেভেল বাংলাদেশের আবহাওয়ার সাথে ১১ থেকে ১৩ শতাংশ সমন্বয় করা নেই। এটা করতে হলে মেশিন তৈরি করার পরেও কমপক্ষে ৪/৫ মাস মেশিনটিকে কাষ্টমারের কাছে বিক্রি না করে রেখে দিতে হয় এবং এরপরে এর ১০০ ভাগ Water Level করে কয়েক স্তরের QC করতে হয় যা আমার নকলবাজ বন্ধুরা জানেন না। এভাবে মেশিন তৈরি করলে মেশিনের দাম একটু বেশি হবে কিন্তু কাষ্টমারকে ঠকানো হবে না। আর এভাবে মেশিন তৈরি করলে মেশিনটা অনেক বছর টিকে থাকবে। কিন্তু নকলবাজরা এগুলো কিছুই অনুসরণ না করে ক্রেতাদের সঙ্গে জালিয়াতি করছেন।”

লাইবা রুটি মেকারের (Rutee Maker) বিশেষত্ব:

”রুটি ও রুটি জাতীয় বিভিন্ন খাদ্য লাইবা রুটি মেকার দিয়ে বানানো যায় খুবই সহজে। যেমন- কাঁচা আটার রুটি, সিদ্ধ আটার রুটি, চালের রুটি, সিঙ্গাড়া, লুচি ইত্যাদি। যন্ত্রটি সম্পূর্ণ কাঠের তৈরি। পিড়া-বেলনে তৈরি রুটির মতো স্বাদ অক্ষুণ্ন থাকে। স্বল্প সময়ে রুটি তৈরি করা যায়। এত সহজ যে শিশুরাও এটি দিয়ে রুটি বানাতে পারবে। বিদেশি ইলেকট্রিক রুটি মেকার দিয়ে সিদ্ধ আটার রুটি হয় না, চালের গুড়ার রুটি হয় না, রুটি পোড়া পোড়া হয়ে যায়, রুটি চামড়ার মত শক্ত থাকে- এই ধরণের নানা অভিযোগ থাকলেও লাইবা রুটি মেকার নিয়ে কোন অভিযোগ নেই।”

লাইবা রুটি মেকার চেনার উপায়:

”লাইবা রুটি মেকার (Laaibah Ruti Maker) আন্তর্জাতিক মানের মোড়কজাত করে বিপণন করা হয়। মোড়কের গায়ে কোম্পানির বারকোড সহ মাগুরার বুনাগাতির ফ্যাক্টরি ও ঢাকার পশ্চিম আগারগাঁওয়ে (৬৭ নম্বর) সিদ্দিক টাওয়ারের চতুথ তলায় অফিসের ঠিকানা উল্লেখ থাকে। একটি কার্টনের মধ্যে জাপানি ফুড কন্টেন্ট পেপার, সিডি, ম্যানুয়াল ও টেপ থাকে। কাঠের যন্ত্রের গায়ে লাইবা রুটি মেকার ফ্যাক্টরির লোগোসহ অ্যালুমিনিয়ামের স্টিকার লাগানো থাকে। লাইবা রুটি মেকারে অতি অল্প চাপে ৮ ইঞ্চি থেকে সাড়ে ৮ ইঞ্চি রুটি হয়। রুটির চতুর্দিকের পুরুত্ব সমান হয় কাগজের মত পাতলা হয়। তবে নকল যন্ত্রে রুটি একদিকে পাতলা আরেক দিকে মোটা হয়।”

লাইবা রুটি মেকারের বাজার :

”২০১১ সালে লাইবা রুটি মেকার উদ্ভাবিত হলেও ২০১৪ সালে পণ্যটি ভালোভাবে বাজারে ছাড়া হয়েছে। আমাদের পণ্য দেশে ও বিদেশে সমানভাবে সমাদৃত হচ্ছে। যুক্তরাজ্যে আমাদের পণ্য নিয়মিত যাচ্ছে। এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপের কয়েকটি দেশ, অস্ট্রেলিয়াতে আমাদের পণ্য গেছে।”

সবশেষে হুমায়ুন কবীর দেশবাসী ও সরকারের প্রতি নকলবাজদের প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, দেশে অনেক সৃজনশীল কাজ হচ্ছে। কিন্তু নকলবাজদের কারণে সেইসব কাজ আলোর মুখ দেখতে পারছে না। এদের বিরুদ্ধে সবাই একযোগে না দাঁড়ালে মানুষ সৃজনশীল কাজের আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে। অনেক সম্ভাবনা মুখ থুবড়ে পড়বে।

যোগাযোগের ঠিকানা:
লাইবা রুটি মেকারের ওয়েবসাইট http://www.rutimaker.com

অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ https://www.facebook.com/laaibahrutimakerfactory/ ও Laaibah ruti maker factory নামে ইউটিউবের চ্যানেল থেকে ক্রেতাদের সতর্ক করা হয়ে থাকে।

ফোন : ০১৭৯৯৬০০০১০-১৭, ০১৭৩১৪৯৪৫০১, ০১৭৪০৮৬১৯১১








Leave a reply