নিষ্পাপ শিশুদের এমন জীবনের জন্য দায়ী কে!

|

বাবার কোলে, মায়ের কোলে চড়ে থাকা শিশুটি ওই বাবা-মায়ের নয়নমনি। ওই বাবা-মায়ের জীবন, পৃথিবী। ওই শিশুটিকে ঘিরে কত স্বপ্ন তাদের দু-চোখে! পৃথিবীর আর সব বাবা-মায়ের মতোই তারা স্বপ্ন দেখে তাদের সন্তান একদিন বড় হবে। কেউ হবে চওড়া কাঁধের শক্তিশালী পুরুষ। যে কাঁধ হবে বাবা-মায়ের অবলম্বন। কোনো সন্তান হবে ডাক্তার, মানুষের সেবা করে বাবা-মায়ের মুখ উজ্জ্বল করবে! কোনো সন্তান বিজ্ঞানী হবে। কেউ মহাকাশ জয় করবে! কেউ বা হবে লেখক কিংবা কবি…কত কিছু! বাবা-মা তাদের দেখিয়ে গর্ব করে বলবে ‘ও আমার সন্তান’। বেঁচে থাকার অর্থ খুঁজে পাবেন বাবা-মা। অথবা কেউ কোনো কিছু না হলেও বাবা-মায়ের দুঃখ নেই। সন্তান বেঁচে থাকলেই, তার মুখের হাসি দেখলেই বাবা-মায়ের সুখ।

বাবার কাঁধে চড়ে যে ছেলেটি নিজ ভূমি ছেড়ে যাচ্ছে, দেখুন তো তার দিকে তাকিয়ে! কি মনে হয়, কেউ কি বন্দুক তাক করতে পারে অমন শিশুর দিকে? কিন্তু তাই হচ্ছে! ‘নিষ্পাপ’, ‘সুন্দর’ কোনো কিছুই যুদ্ধবাজ, বর্বর মানুষকে থামাতে পারে না! তার নিষ্ঠুর হৃদয় তার হাতের বন্দুক তাক করেই ছাড়ে। কোনো কিছুতেই ক্ষান্ত হয় না যুদ্ধবাজ মানুষগুলো!

কনকনে ঠান্ডার মধ্যে পুতুলের মতো শিশুটিকে কোলে নিয়ে যে মা দাঁড়িয়ে আছেন খোলা জায়গায় তার চেহারা দেখে কি কারও মনে দরদ জাগে না! মায়ের চেহারায় যে দুশ্চিন্তার ছাপ তা তার জন্য যতোটা নয়, তার চেয়ে বেশি তার সন্তানের জন্য। তিনি তার সন্তানকে একটি নিরাপদ পৃথিবী উপহার দিতে চান। কিন্তু পৃথিবীর যুদ্ধবাজ মানুষগুলো তা দিচ্ছে না! মায়ের মনে শঙ্কা তার শিশুটির ভবিষ্যৎ কি হবে! কোথায় গেলে নিরাপদ আশ্রয় দিতে পারবেন তার শিশুকে, যেখানে কোনো ভয় নেই!

দল বেঁধে যে নারী আর শিশুরা হেঁটে যাচ্ছে তাদের কি এখন একটি নিরাপদ আশ্রয়ে, নিজের ঘরে থাকার কথা নয়! তাদের কি এখন বই নিয়ে পড়তে বসার কথা নয় নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার জন্য? যেখানে থাকবে পৃথিবীর কল্যাণের ব্রতও! তাদের কি আনন্দ করে খেলা করা, মুক্তভাবে প্রাণখুলে গান করা কিংবা হাসি-আড্ডা কিংবা খেলা করার সময় নয়? কেউ কি বলতে পারবে কোন অপরাধে তাদের এই ভোগান্তি! কোন অপরাধে তাদের চেহারা থেকে হাসি চলে গেল? কোন অপরাধে তাদের এই অনিশ্চয়তার জীবন? এর জন্য দায়ী কে?

ইউক্রেনের মানবাধিকার কমিশনার জানিয়েছেন, রবিবার পর্যন্ত দেশটিতে ২১০ জন নিহত হয়েছে। যার মধ্যে কয়েকজন শিশুও রয়েছে। নিহতদের মধ্যে পলিনা নামে এক মেয়ে শিশু ছিল যে রাজধানী কিয়েভের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শেষ বর্ষের শিক্ষার্থী। কিয়েভের স্থানীয় কর্তৃপক্ষ বলছে, রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম এলাকায় একটি রাস্তার ওপর তাকে এবং তার বাবা-মাকে গুলি করে হত্যা করে টহলরত সহিংস রাশিয়াপন্থী একটি দল।

পলিনার ভাই এবং বোনকে হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। তার বোন নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে রয়েছে এবং ছোট ভাইকে শিশু হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে।

একটি কিন্টারগার্টেনে হামলায় সাত বছর বয়সী একটি মেয়ে শিশু নিহত হয়েছে। এছাড়া ইউক্রেনের জাতিগত গ্রিক সম্প্রদায়ের একটি গ্রামে হামলার কারণে ওই সম্প্রদায়ের ১০ জন নিহত হয়েছে।

ব্যাপারটি কেবল ইউক্রেন বলে নয়, ইউক্রেন তো একটি উদাহরণ মাত্র। ব্যাপারটি পৃথিবীর যে কোনো জায়গার জন্য প্রযোজ্য। ইউক্রেন কেবল চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে আমরা এখনও এগুতে পারিনি। পৃথিবী মানুষের জন্য বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি। পারেনি কোনো শিশুর জন্যও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে!

ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধ জানি না কতদূর গড়াবে, কতদিনে থামবে! আজ আলোচনা হলো। সিদ্ধান্ত কি হয়েছে তা হয়তো আজই জানতে পারবো। কিন্তু তা খুব একটা সুখদায়ক হবে বলে মনে হয় না। কারণ, পৃথিবীতে কিছু মানুষ মিথ্যা অহংকার আর লোভে আচ্ছন্ন। এখানে এখন বৈষম্য চূড়ান্ত। কিছু মানুষের হাতে অঢেল অর্থ, ক্ষমতা। তারা নিজেদের মানুষ মনে করে না। তারা অন্য মানুষদের তুচ্ছ মনে করে। তাদের ‘তুচ্ছ’ মনে করা মানুষের ঘরে থাকা নিষ্পাপ, পবিত্র, আদরের শিশু সন্তানগুলোর কথাও ওইসব দাম্ভিক, লোভী মানুষেরা ভাবে না! তাদের ওপর যথেচ্ছা আচরণ করে। আর তার ফলস্বরূপ ভোগান্তি নেমে আসে ফুলের মতো অবুঝ শিশুগুলোর জীবনে!

ছবিতে দেখা নিরপরাধ নির্ঝঞ্ঝাট জীবন যাপন করতে চাওয়া নারী ও শিশুগুলোর চেহারা আমাদের বলে দিচ্ছে আমরা কারও জন্য নিরাপদ একটি পৃথিবী গড়তে পারিনি। বলে দিচ্ছে, এ পৃথিবীতে আমরা আজ বড় অসহায়। এই ছবি বলে দিচ্ছে, পৃথিবী এখনও অসভ্য, নিষ্ঠুর মানুষের দখলে!

কিশোর কুমারের একটি গান আছে এমন, ‘আ চলকে তুঝে মে লে কে চলু এক অ্যাইসে গগন কে তলে, যাহা গম ভি না হো, আছু ভি না হো, ব্যাস পেয়ার হি পেয়ার পালে…’। প্রতিটি বাবা-মা ই চান তার সন্তান বেঁচে থাকুক আদর-আহ্লাদে! তাদের জন্য চান এমন একটি পৃথিবী যেখানে কোনো দুঃখ নেই, কান্না নেই, আছে কেবল ভালোবাসা!

ছবিতে যেসব বাবা-মা কে দেখা যাচ্ছে তারাও তাদের সন্তানদের জন্য একরকম একটা পৃথিবী চান। যে পৃথিবীতে কোনো দুঃখ নেই, কান্না নেই, আছে কেবল ভালোবাসা! তেমন একটা পৃথিবী হয়ে উঠুক আমাদের পৃথিবীটা-এই কামনা।




Leave a reply