যিনি প্রযুক্তির মাধ্যমে ইংলিশ লার্নিং এবং IELTS প্রিপারেশনে দেশে বিপ্লব সৃষ্টি করলেন [ এক অনবদ্য জীবনের গল্প ]

|

প্রত্যেক সফল মানুষ তাদের জীবনে এক একটা অদ্বিতীয় পথ পার করে থাকেন। একেকজনের গল্প একেকরকম। আর তাই তো তাদের কথা শুনতেও ভালো লাগে। আজ আমরা এমন একজন মানুষের সম্পর্কে জানবো যিনি বাংলাদেশে ইন্টারএকটিভ প্রযুক্তির মাধ্যমে অনলাইনে ইংলিশ শেখা এবং IELTS প্রিপারেশন নেয়ার বিপ্লব সৃষ্টি করেছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএ থেকে এমবিএ ডিগ্রি অর্জন করে তারপর তিনি অনলাইন জগতে সফল বিজনেস প্রতিষ্ঠা করেন। পাঠক, এ পর্যন্ত পড়েই আপনার হয়তো মনে হতে পারে যে নতুন কিছু করতে মেধাবীরা তো পারবেই । কিন্তু এখানেই তিনি ব্যতিক্রম। দেশের সেরা মেধাবীদের মধ্যে মাত্র একশ জনের মতো প্রতিবছর আইবিএ থেকে এমবিএ করার সুযোগ পান। কিন্তু এসএসসির একটা ঘটনার পর এক ধরণের বিপর্যয় থেকে আজ তিনি কিভাবে এই পর্যায়ে আসতে পারলেন এটাই একটি চমকপ্রদ বিষয়।
এসএসসিতে রেজিস্ট্রেশনের সময় ভুল করে তাঁর বয়স ৪ বছর ৫ মাস বেশি লেখা হয়। অর্থাৎ যখন তাঁর বয়স আসলে ১৭ বছর কিন্তু পরীক্ষার কিছুদিন আগে রেজিস্ট্রেশন কার্ড হাতে পেয়ে দেখেন সেখানে তাঁর বয়স ২১ বছর। পরের বার নতুন করে রেজিস্ট্রেশন করলেও আবার ২ বছর পিছিয়ে থাকা। তাই আর নতুন করে এসএসসির রেজিস্ট্রেশন করেন নাই।বাবা ছিলেন সেই সময়ের সরকারি কর্মকর্তা। তিনি ছেলের মেধা নিয়ে এতোই নিশ্চিত ছিলেন যে এই কারণে পরিবারের কেওই অত টেনশন করেননি।তবে এইচএসসির পর বুয়েট, মেডিকেল বা ঢাবিতে বয়সের এই তারতম্যের কারণে পরীক্ষা দিতে পারেননি। অথচ তাঁর আরেক ভাই এবং আরেক বোন বুয়েটের ছিলেন। আর তাঁদের পরিবারের ৫/৬ জন বিসিএস ক্যাডার। পরিবারের সবাই মেধাবী। কিন্তু ছোটবেলা থেকেই তাঁর বাবার ভাষ্যমতে তিনি ছিলেন সব থেকে বেশি মেধাবী। যার নমুনা আজ দেখা যাচ্ছে তাঁর কাজের মধ্যে দিয়ে। তাঁর পরিবারের কোনো অফিসারকে নিয়ে নিউজ হয় না কিন্তু ব্যক্তিগত সাফল্যে ২০১৯ সালে সব থেকে বেশি ভাইরাল হওয়া একাধিক নিউজের শিরোনাম তিনি। সফল উদ্যোক্তা হিসেবে বিজনেস করছেন এবং গত বছর দেশের সেরা ক্রিয়েটিভ মার্কেটিং জিনিয়াসের খেতাবও পেয়েছেন। গত কয়েক বছরে নিজের বিজনেসের ইকুইটি নিয়ে গেছেন কোটি টাকার উর্ধে। বিজনেসের ইকুইটি হলো কোনো বিজনেস মালিক চাইলে বিক্রি করে দিতে পারেন। ৪ বছরে প্রায় ৫০ লক্ষ টাকা বিনিয়োগের বিপরীতে প্রায় তিনগুন মার্কেট ভ্যালু তৈরী করা এবং সেটা অনলাইনের মতো একটা অদৃশ্য জায়গায়। তিনিই বাংলাদেশে প্রথম ব্যবসায়ী যিনি অনলাইনেই পূর্ণাঙ্গ সার্ভিস দেয়া হচ্ছে এমন একটা বিজনেস মডেল তৈরী করেছেন ! বিদেশ থেকেও সার্ভিস নিচ্ছেন অনেকে।বাইরে থেকে শুধু সার্ভিস নেয়াই নয়, নিজের দক্ষতার বিচ্ছুরণ ছড়িয়ে গেছে দেশের বাইরেও। আগামী বছর সিঙ্গাপুর ভিত্তিক ইয়ুথ এন্ড মানি জার্নালের এশিয়ার ১০ জনের মধ্যে দ্বিতীয় স্থানে থেকে তাদের বিশেষ ফিচারের শিরোনাম হবেন তিনি।
তাঁর ব্যাপারে বিশদ লেখার আগে আমরা চলে গিয়েছিলাম আইবিএ হোস্টেলে যিনি তার জীবনের শেষ একাডেমিক বছরগুলো কাটিয়েছেন। ৪ বছর হয়ে গেছে তিনি হল ত্যাগ করেছেন কিন্তু এখনো এক নামে পরিচিত । সবার সাথে হাসিমুখে কথা বলা, সবার খোঁজ খবর রাখা এসবই ছিল তাঁর প্রধান বৈশিষ্ট। এক সহপাঠীর সাথে কাকতালীয়ভাবে দেখা হয়ে গিয়েছিলো সেখানে। তিনি বলেন, কবির ভাই আগে থেকেই অনেক টাকা পয়সা উপার্জন করতেন। সবার পেছনে খরচও করতেন। একদম খোলা হাত ছিল। অনেক সহপাঠীর তখন স্যুট ছিল না। কিন্তু এমবিএতে প্রেজেন্টেশনের সময় স্যুট থাকতে হয়। যাদের স্যুট লাগতো তিনি হাসিমুখে সরবরাহ করতেন। আসলে এমন একজন মানুষ নিয়ে লিখতেও ভালো লাগে। আর পাঠক পড়তেও চান।
পরিবারের সাথে কথা বলে জানা যায়, আইবিএ (ঢাবি) থেকে এমবিএ শেষ করেই তিনি বিজনেস ডেভেলপমেন্টে মনোনিবেশ করেন। এখন বয়স ৩৪ বছর। এই বয়সে যখন দেশের অন্য মেধাবীরা ৫০ হাজার টাকার বেতনের চাকরি করে বছরে ১০% ইনক্রিমেন্টের অপেক্ষা করে তখন তিনি নিজে লক্ষ টাকা রেভিনিউ মডেল তৈরী করছে এমন একটা বিজনেসের মালিক। সামনে যে যে প্রোডাক্ট মার্কেটে ছাড়বেন, তাতে তাঁর বর্তমান মডেলের পরিধি বাড়বে বহুগুন। বর্তমান বিজনেসের ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে অনেক বড় পরিকল্পনা নিয়ে আগাচ্ছেন। সোজা কথায় যেটা বলা যায়, তাঁর বর্তমান সফলতায় পৌঁছতে প্রায় ৪৫ বছর লাগার কথা। কিন্তু তিনি ১০/১২ বছর আগেই সেটা করে ফেলেছেন। আজ সরাসরি কথা বলবো কবির স্যার বলে খ্যাত এই সফল উদ্যোক্তার সাথে।
কেমন আছেন ?
“আলহামদুলিল্লাহ, ভালো আছি।”
একটা প্রশ্ন প্রথমেই করতে চাই। অনলাইনে এমন এক্সপেন্সিভ বিজনেস মডেল কিভাবে সফল করলেন ? আমরা অনলাইন বলতে তো বুঝি খরচ কম ?
“দেখুন, বিজনেস ডেভেলপমেন্ট একটা বিশেষ দক্ষতা। সাথে মার্কেটিংও। আমাদের এই দুই দক্ষতা ছিল বলেই আজ সফল করতে পেরেছি।”
এখন বিশেষ করে কারা আপনাদের এখানে এডমিশন নেয় ?
“যারা চাকরি করেন। বাইরে গিয়ে ক্লাস করার সময় যাদের নেই। আর অনেক মেয়েরাও এখন অনলাইনই প্রেফার করছে।”
একটা বিষয় জানতে চাই। আইবিএ থেকে এমবিএ ডিগ্রি নিয়ে প্রেস্টিজিয়াস চাকরি না করে বিজনেস শুরু করার প্রেরণা কিভাবে পেলেন ?
“দেখুন, অনেক সময় না চাইতেও অনেক কিছু হয়ে যায়। আমার ব্যাপারে কিছু জিনিস এমন হয়েছে। যেটা আপনি বলেছেন। আমি আর বলতে চাচ্ছি না। আমরা আসলে কে কি করবো তা অনেকটাই নির্ধারিত। আমার সাথে যারা এমবিএ করেছে তারা রাত ১০ টাতেও অফিস থেকে বাসায় ফেরে। আর আমার এখন বাসা থেকে বের না হলেও চলে। আমার মনে হয় আগে এক সময় অনেক পরিশ্রম করতাম। পড়াশোনা করতাম। তাই এখন আল্লাহই এমন একটা ব্যবস্থা করে দিয়েছেন যেন অল্প বয়সেই একটু আরাম করতে পারি। আর এটা ভাবার কিছু নেই যে আমি শুধু আর্থিক বিষয়টাই দেখেছি। এখন আমি একটা ব্র্যান্ডের মালিক। একটা সফল কিছুর ওপর আজীবন নিজেই নিয়ন্ত্রণ করবো এমন একটা প্রেরণা থেকেই আসলে বিজনেসে আসা। আপনি এভাবে দেখুন, আমার এই বয়সে আমি একটি ব্র্যান্ডের মালিক। ঠিক এমন একটা অনুভূতি একদিন হবে, তাই বিজেনেসই শুরু করেছিলাম। তবে এই সময়ের মধ্যেই সফলভাবে এমন একটা রেভিনিউ মডেল তৈরী করতে পারবো এমনটা আশা করিনি। আল্লাহ চেয়েছেন তাই হয়েছে। ”
যারা বিজনেসকে ক্যারিয়ার হিসেবে নিতে চায় তাদের জন্য আপনার বক্তব্য কি ?
“দক্ষ হতে হবে। চাকরি করতে গেলে একটা বিশেষ দিকে দক্ষ হলেও চলে। কিন্তু বিজনেসে আসতে হলে অলরাউন্ডার হতে হবে। আর প্রথম দিকে অনেক পরিশ্রম করার মানুষিকতা থাকতে হবে। বিজনেসে সফলতার একটা বিশেষ মজা হলো স্বাধীনতা। দেখুন, আজ আমি চাইলেই ১৫ দিন দেশের বাইরে গিয়ে ঘুরে আসতে পারি। কিন্তু চাকরি করে এটা সম্ভব ? তবে এই পর্যায়ে আসতে যে ধরণের ত্যাগ স্বীকার করতে হয় তা আমাদের বেশিরভাগ মানুষেরই নাই। তাই তারা বিজনেসে আসতেও ভয় পায় । “
ইউটিউব চ্যানেল নিয়ে আপনাদের এখন কি পরিকল্পনা ?
“আমাদের প্রায় ১০০০ ভিডিও তৈরী হয়ে আছে। এগুলোর একেকটা বিশেষ উদ্দেশ্য আছে। এ নিয়ে কথা বললে দীর্ঘ সময় লাগবে। যখন প্রচার হবে তখন দেখতে পারবেন।”
শেষ একটা প্রশ্ন করতে চাই। আপনার সাথে যারা এমবিএ শেষ করেছেন তাদের সাথে আপনি আপনার অবস্থানের তুলনামূলক মূল্যায়ন কিভাবে করেন?
“দেখুন, আসলে আমরা কে কি করবো তা আল্লাহর ইচ্ছা। আর আমি একাডেমিক পড়াশোনার বাইরে অনেক বই পড়তাম। আসলে কতটা বই পাগল ছিলাম সেটা আমাকে গত ১৫ বছর দেখলে বুঝা যেতএ নিয়ে বলতে পারেন বাসায়ও অনেক কথা হতো। আমি এখন বুঝি আমি কেন এখন এই জায়গায় এসে এমন একটা প্লাটফর্মে কাজ করতে পারছি। এমবিএ-তে আমার সহপাঠীরা এখন এসিস্টেন্ট ম্যানেজার স্টেজ এ আছে। আসলে একটা সফল বিজনেসের মালিক হওয়া কোনো জব এর কোনো পজিশনের সাথে তুলনা করা যায় না। বিজনেসের তুলনা বিজনেসের সাথেই হয়।”
আপনি গতবছর একটা ভিডিও ইন্টারিভউতে একটা বই এর কথা বলেছিলেন। যেটা প্রকাশ হলে দেশের ইংলিশে অনেক প্রভাব ফেলবে। সেটা কবে নাগাদ বাজারে আসবে ?
বইটা লেখা শেষ। প্রায় ৩ বছর লেগেছে। এখন এডিট চলছে। গত রোজার পর পরই প্রিন্ট হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু একটা বিশেষ কারণে আপাতত পাবলিকেশন বন্ধ রেখেছি। আশা করি খুব শীঘ্রই বাজারে আসবে। ”
একটা শেষ প্রশ্ন। কোনো বড় ত্যাগ ছাড়া নাকি বড় কোনো অর্জন সম্ভব হয় না। আপনার ক্ষেত্রেও কি ব্যাপারটা সত্য? আপনার মাত্র ৩৩ প্লাস বয়সে এই রকম একটা অর্জন, সেজন্য প্রশ্নটা করলাম।
“অন্যদের কথা বলতে পারবো না, তবে আমার ক্ষেত্রে এটা ভীষণভাবে সত্য। এখানে কিছুটা ব্যক্তিগত বিষয় আছে যার কারণে আমি এই ব্যাপারে বেশি কিছু বলতে পারছি না।”
ঠিক আছে। তবুও আপনাকে অনেক ধন্যবাদ আমাদের সময় দেয়ার জন্য।









Leave a reply