শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে ‘পরিবেশ ক্যাডার’ নিয়োগের পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের

|

শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণে বিসিএস ক্যাডারের মতো ‘পরিবেশ ক্যাডার’ নিয়োগের পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। পাশাপাশি পরিবেশ পুলিশিং কার্যক্রম চালুরও দাবি জানিয়েছেন তারা।

বৃহস্পতিবার (৩ মার্চ) সকালে জুম অনলাইন প্ল্যাটফর্মে আন্তর্জাতিক শ্রবণ দিবস উপলক্ষে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস) এবং ইকিউএমএস কনসালটিং লিমিটেডের যৌথ উদ্যোগে ‘শব্দদূষণ’বিষয়ক ওয়েবিনারে এ পরামর্শ দেন সংশ্লিষ্টরা।

আন্তর্জাতিক শ্রবণ দিবস ২০২২ উপলক্ষে প্রাণ-প্রকৃতির ওপর শব্দদূষণের প্রভাব ও প্রতিকার শীর্ষক ওয়েবিনার অনুষ্ঠিত হয়।

বক্তব্যের শুরুতে বায়ুমণ্ডলীয় দূষণ অধ্যয়ন কেন্দ্র (ক্যাপস)-এর প্রতিষ্ঠাতা ও চেয়ারম্যান এবং স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, শব্দদূষণ নিয়ন্ত্রণ করতে হলে বিসিএস ক্যাডারের মতো পরিবেশ ক্যাডার নিয়োগ দিতে হবে, পাশাপাশি পরিবেশ পুলিশিং কার্যক্রম চালু করতে হবে।

তিনি আরও বলেন, ‘প্রতিটি উপজেলায় প্রাণিসম্পদ রক্ষায় একজন প্রাণী কর্মকর্তা, কৃষির জন্য কৃষি কর্মকর্তা, সমাজসেবা কর্মকর্তা রয়েছেন। এরা সবাই কিন্তু বিসিএস ক্যাডার। বিসিএস ক্যাডার বলেই তারা উপজেলা পর্যায়ে যেকোনো ডিসিশন মেকিংয়ে গুরুত্ব পান এবং তারা তাদের কার্যক্রমগুলো সুন্দরভাবে পরিচালনা করতে পারেন। একটি উপজেলা লেভেলে বা স্থানীয় পর্যায়ে যদি একজন পরিবেশ কর্মকর্তা থাকেন, যিনি প্রশাসন ক্যাডারের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান, তাহলে উনি পরিবেশদূষণের জন্য যারা যারা দায়ী, তাদের সবাইকে আইনের আওতায় আনার জন্য সার্বক্ষণিকভাবে নিয়োজিত থাকবেন এবং খুব সফলতার সঙ্গে তারা কাজ করতে পারবেন।’

এই গবেষক আরও বলেন, ‘আমাদের জেলা পর্যায়ে বা দুটি বা তিনটি জেলাকে একত্রিত করে সমন্বয় করার জন্য জেলা পর্যায়ে একটি অফিস আছে। জেলা পর্যায়ে কর্মকর্তা যারা, তারা কিন্তু বিসিএস ক্যাডার থেকে যাচ্ছে না। তারা যাচ্ছে নন-ক্যাডার থেকে। ফলে জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা হওয়ার পরও একটি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করার জন্য, দূষণ রোধে বা পরিবেশসংক্রান্ত অন্যান্য কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার জন্য এবং ওনাদের ডিসি অফিসে গিয়ে বসে থাকতে হয়। ম্যাজিস্ট্রেটদের পাওয়ার জন্য দরখাস্ত দিয়ে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয় এনফোর্সমেন্ট পাওয়ার জন্য। এতে দূষণকারীরা তো আর বসে থাকে না। ফলে দূষণকারীরা উৎসাহী হয় এবং দূষণ কার্যক্রমে নিজেদের আরও পাকাপোক্তভাবে সম্পৃক্ত করে। ফলে নদী দখলকারী, নদীদূষণকারী, অবৈধ ইটভাটা, বায়ুদূষণকারী, শব্দদূষণকারীরা সুযোগ পেয়ে যাচ্ছে।

সে জন্যই বলছি, আমরা যদি পরিবেশ ক্যাডার সার্ভিস চালু করতে পারতাম এবং উপজেলা পর্যায়ে তাদের জন্য একটা কার্যালয় প্রতিষ্ঠা করতে পারি তাহলে আমরা উপজেলা পর্যন্ত পরিবেশকে সংরক্ষণ করতে পারতাম।’

অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, ‘নদীমাতৃক বাংলাদেশ হওয়ায় নদীগুলো সারা দেশেই জালের মতো ছড়িয়ে আছে। নদী দখল ও দূষণের তালিকাও নদী কমিশন করেছে। সারা বাংলাদেশে প্রায় ৬০ হাজার এনলিস্টেড দখলদার আছে। দ্বিতীয়ত, আট হাজার অবৈধ ইটভাটা সারা দেশেই বায়ুদূষণ করছে। সারা দেশে প্রায় এক-তৃতীয়াংশ অর্থাৎ ৩১ লাখ যানবাহন ফিটনেস ছাড়াই চলাচল করছে। তারা বায়ুদূষণ, শব্দদূষণ সবকিছুই করছে। দূষণ শুধু ঢাকা বা মহানগরী পর্যায়েই নয়, দূষণ আজ সারা দেশই ছড়িয়ে পড়েছে। এ কারণে সারা দেশকেই দূষণ নিয়ন্ত্রণে যে মহাপরিকল্পনা, সেই মহাপরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। সেটি কার্যকর করতে হলে পরিবেশ ক্যাডার এবং সেই সঙ্গে পরিবেশ পুলিশিং কার্যক্রম চালু করতে হবে।’

এ সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসিম উদ্দিন বলেন, শব্দ যদি দূষণ পর্যায়ে চলে যায়, তাহলে উদ্ভিদে প্রজাপতি, কীটপতঙ্গ বসতে পারে না, তারা না এলে উদ্ভিদের পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আর পরাগায়ন বাধাগ্রস্ত হলে উদ্ভিদে ফল-ফুল কিছুই আসবে না। এর মধ্য দিয়ে উদ্ভিদের বিস্তার কমে যাবে। আর এর পেছনে শব্দদূষণ দায়ী। তাই শব্দদূষণ অবশ্যই নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। শুধু দেশকেই ভালোবাসলে হবে না, দেশের সব উপাদানকেই ভালোবাসতে হবে। দেশীয় বিপন্ন উদ্ভিদ দিয়ে যদি শহরটা সাজাতে পারি, তাহলে সাউন্ড ব্রেকার হিসেবে উদ্ভিদ কাজ করবে। ফলে ধীরে ধীরে শব্দদূষণ কমে আসবে। পরিবেশ রক্ষা করা না গেলে শুধু উন্নয়ন দিয়ে আমরা টিকে থাকতে পারব না। তাই উন্নয়ন ও পরিবেশ দুটোকেই বান্ধব করে উন্নয়ন করতে হবে।

আলোচনায় আরও অংশ নেন স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. ইউসুফ মিয়া, পরিবেশ অধিদফতর ঢাকা অঞ্চলের পরিচালক মো. জিয়াউল হক, বাংলাদেশ প্রাণিবিজ্ঞান সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. গুলশান আরা লতিফা, বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান, বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) সাধারণ সম্পাদক শরীফ জামিল, নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান ও ব্যবস্থাপনা বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. জাকারিয়া, শ্রবণ ব্যাধি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. নাসিমা খাতুন, প্রজনন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. মোসা. রাশিদা বেগম, ইউকিএমএস কনসালটিং লিমিটেডের নির্বাহী পরিচালক কাজী ফরহাদ ইকবাল প্রমুখ।




Leave a reply