বাসের স্কুলে স্বপ্নের হাতেখড়ি

|

বাসের গাজুড়ে রঙিন আঁকিবুঁকি—পেনসিল, কম্পাস, স্কেলসহ আর কত কী। চেনা এসব শিক্ষা উপকরণের মধ্যেই স্কুলপড়ুয়া শিশুর মুখ। পিঠে যার স্কুলব্যাগ, মুখে নির্মল হাসি। বাসের অপর পাশেও হাস্যোজ্জ্বল এক শিশুর ছবি। তার হাতে বইয়ের সঙ্গে যে ট্যাবলেট, আলাদা করে দৃষ্টি কাড়ে। তাই প্রথম দর্শনে রঙিন স্টিকারে মোড়ানো বাস দেখে আর দশটা স্কুলবাস বলেই মনে হয়েছিল। কিন্তু ভুল ভাঙল ভেতরের গুঞ্জন, শ্রেণির কক্ষের খুনসুটি, খুদে পড়ুয়াদের গলা মিলিয়ে পড়ার আওয়াজে—‘স্বরে অ…’, ‘স্বরে আ…’।

রঙিন বাসটা আদতে একটি স্কুল, স্কুলের বাস নয়। নাম—চাকার স্কুল। ছয় চাকার বাসের ভেতরটা শ্রেণিকক্ষ। স্কুলটি রাজধানীর চারটি এলাকায় ঘুরে ঘুরে পড়াচ্ছে বলেই নামকরণ করা হয়েছে ‘চাকার স্কুল’। সহজ করে বললে, চাকার ওপর স্কুল।

দরজা পেরিয়ে চালকের অংশের পর যাত্রীদের আসন থাকার কথা। সেসব আসনের বদলে তৈরি করা হয়েছে বসার জায়গা। তাতেই তৈরি হয়েছে বিশেষায়িত শ্রেণিকক্ষ। পরিপাটি সে শ্রেণিকক্ষে হোয়াইট বোর্ড, টেবিলে শিক্ষকের ডাস্টার, হাজিরা খাতার মতো চিরচেনা উপকরণ তো আছেই, সেই সঙ্গে আছে গ্রন্থাগারও। বাসের পেছনের অংশে তৈরি করা হয়েছে যে তাক, সে তাকেই আছে বই, খেলনা, আর মাঝ বরাবর বড়সড় টেলিভিশন। করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি মেনে দুই পাশে মুখোমুখি বসেছে খুদে শিক্ষার্থীরা। তাদের মুখে মাস্ক, হ্যান্ড স্যানিটাইজার হাতে মাখিয়ে শুরু হয়েছে পাঠপর্ব। কেউ কেউ পরেছে ফেস শিল্ড। মাস্ক পরায় অভ্যস্ত হয়ে উঠলেও ফেস শিল্ড কপালে বেঁধে রাখতে যে ওরা অনভ্যস্ত, তা বোঝা যাচ্ছিল বারবার তা খুলে ফেলায়! তবু মাস্কে ঢাকা মুখেও স্কুলে আসার যে উচ্ছলতা, তা ফুটে উঠছিল চোখের ভাষায়।

একসময় ক্লাস শুরু হলো জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে। তারপর শরীরচর্চা। ক্ষণিকের ব্যায়ামের পর অক্ষরজ্ঞানের ক্লাস শুরু করলেন শিক্ষক। শ্রেণিকক্ষের দুই পাশে দেয়ালে ছবি মিলিয়ে সাঁটানো আছে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, ইংরেজি বর্ণ আর গণিত। সেসবই পড়ানো হচ্ছিল তাঁদের। হাতে তুলে দেওয়া হলো ট্যাবলেট কম্পিউটার। বিশেষ অ্যাপে খুলে দেওয়া হয়েছে স্বরবর্ণ। প্রতিটি বর্ণে চাপ দিলে কথা বলে ওঠে যন্ত্রের শিশু—অ-তে অজগর। শিক্ষার্থীরাও কণ্ঠ মেলায় যন্ত্রের সঙ্গে।

রাজধানীর চারটি স্থানে দিনের নির্দিষ্ট সময় হাজির হবে এই চাকার স্কুল। নিম্ন আয়ের পরিবারের ৩০ জন করে মোট ১২০ জন শিশু পাবে পড়াশোনার সুযোগ। যাদের প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা দেওয়া হবে বছরজুড়ে। তারপর এই শিশুদের ভর্তি করানো হবে কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বাসের বিদ্যালয়টি পরিচালনাকারী সংগঠন ইটস ফর হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের তথ্য এটি।

ঢাকার মিরপুরের শিন্নিরটেক এলাকায় গিয়ে বাসে যাদের দেখা গেল, সেই শিশুরা এসেছে পাশের বস্তি থেকে। কারও বাবা রিকশাচালক, কারও মা গৃহপরিচারিকা। এই মা-বাবারা হয়তো স্বপ্ন দেখেন নিজের সন্তানকে পড়াশোনা করানোর। অনেকের চেষ্টাও হয়তো আছে। চাকার স্কুল সেই চেষ্টাকে সহজ করে দিয়েছে।

ইটস ফর হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা আদনান হোসাইন। এই তরুণ জানালেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের পড়ার সুযোগ তৈরি করতেই তাঁর গ্রামের বাড়ি নীলফামারীর সৈয়দপুরে সংগঠনের যাত্রা শুরু হয়। এখন তাঁদের তিনটি স্কুলে ৩৫০ জন শিক্ষার্থী পড়াশোনার সুযোগ পাচ্ছে। ২০১০ সালে স্কুলের মাধ্যমে শুরু হলেও এখন শিক্ষা কার্যক্রমের সঙ্গে সামাজিক নানাবিধ কাজের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছে ইটস ফর হিউম্যানিটি ফাউন্ডেশন। ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক আদনান বলছিলেন, ‘চাকার স্কুলে আমরা ৫ থেকে ৭ বছর বয়সী শিশুদের প্রাক্‌-প্রাথমিক শিক্ষা দান করব। তাদের নৈতিক মূল্যবোধ সৃষ্টিসহ মানসিক বিকাশে চাকার স্কুল ভূমিকা রাখবে।’

এ বছরের মার্চ থেকে স্কুলটি চালু হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারির কারণে তা সম্ভব হয়নি। তবে আগস্ট থেকে মিরপুরে স্বল্প পরিসরে কার্যক্রম শুরু করে চাকার স্কুল। বর্তমানে ১৬ জন শিক্ষার্থীকে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দুটি শাখায় পাঠদান করানো হয়। দুটিই মিরপুর এলাকায়। পরে তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর ও টঙ্গীতেও শুরু হবে চাকার স্কুলের কার্যক্রম।

স্কুলের শুরু এ বছর হলেও পরিকল্পনা বছর পাঁচেক আগের। ‘চাকার স্কুল’ নামের স্বত্বও নেওয়া হয়েছে বছর দুই আগে। আদনান বলছিলেন, ‘২০১৮ সালে আমরা পরিকল্পনা চূড়ান্ত করি। এরপর সহযোগিতার জন্য বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রস্তাব পাঠাই। কয়েকটি সংস্থা আমাদের পাশে দাঁড়িয়েছে। তাদের কেউ বাস কিনে দিয়েছে, কেউ জোগান দিচ্ছে শিক্ষকদের বেতনসহ আনুষঙ্গিক খরচের।’

আদনানের কাছে ইটস ফর হিউম্যানিটির গল্প শুনতে শুনতেই স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজে। সার ধরে নেমে আসে পড়ুয়ারা। হাতে তুলে দেওয়া হয় কেক আর জুস। খাবার পেয়ে ইয়াসমিনের মুখে যেন আনন্দ আর ধরে না। তাকে জিজ্ঞেস করি, কী পড়লে আজ? চটপটে ইয়াসমিন বলে, ‘আমি এ, বি, সি, ডি পড়ছি। ক, খ পড়ছি।’ তুমি স্কুলে কেন আসো? নির্মল হাসিতে সে বলে, ‘বিস্কুট পাই, চকলেট পাই…’। কথা হারিয়ে ফেলে মেয়েটা।

ইয়াসমিনের মতো এই শিশুদের অনেকের হাতেখড়ি চাকার স্কুলে। শুধু তো আর বিদ্যার শুরু নয়, তাদের মনের মূল ধারায় প্রতিষ্ঠিত হওয়ার স্বপ্ন দেখার শুরুটাও এ স্কুলে। তাই চাকার স্কুলেই হয়েছে পিছিয়ে পড়া এই শিশুদের স্বপ্নের হাতেখড়িও।








Leave a reply